1. admin@bangladeshbarta71.com : admin :
রবিবার, ২৯ মে ২০২২, ০৫:৪৬ অপরাহ্ন

ভেজাল খাদ্যে সয়লাব দেশ হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

বাংলাদেশ বার্তা ৭১
  • আপডেট সময় : রবিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২১
  • ১৩২ বার পঠিত

গোলাম মোস্তফা
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ধ্বংস যজ্ঞে বিশে^র বিভিন্ন দেশে খাদ্যের চরম অভাব দেখা দিলে ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য সংস্থা গঠন করা হয়। ১৯৭৯ সালে বার্ষিক সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯৮১ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন করা হয়। বিশ্বের ১৫০টি দেশ যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিনটি পালন করে থাকে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দুর্যোগগ্রস্ত ও যুদ্ধ বিধ্বংস এলাকায় খাদ্য সহায়তাদান এবং খাদ্যের অপচয়রোধের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয় এদিবসে। আমাদের দেশের খাদ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন দিবসটি পালন করে ্এবং ভেজালমুক্ত খাদ্য উৎপাদনের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ ও ভেজাল বিরোধী অভিযানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ্য মনের জন্য ভেজালমুক্ত সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরন, ফাস্টফুট, হোটেল রেস্টুরেন্ট এমনকি শিশু খাদ্য তৈরিতেও রয়েছে ভেজালের জয়যাত্রা। জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ২০১৮ সালে ৪৩টি ভোগ্য পণ্যের মোট ৫৩৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করলে ল্যাবরেটরিতে ৪৩টি পণ্যের সবকটিতেই ভেজাল পাওয়া যায়। অন্যান্য পণ্যে ভেজালের পরিমান ৪০ ভাগ থাকলেও ১৩টি পণ্যে ভেজালের হার ছিল প্রায় শতভাগ। যার কারণে এর কুফলও ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের। আর এসকল ভেজাল খাদ্য গ্রহনের ফলে ডায়াবেটিক, হার্টের সমস্যা, গ্যাসট্রিক, আলসার, কিডনি ডেমেজসহ ক্যান্সারও মহামারী আকার ধারণ করছে।
দেশীয় উৎপাদিত সবজি ও ফল মুলে অতিমাত্রায় ক্ষতিকর কীটনাশক রাসায়নিক পদার্থ ও হরমোন ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ স্বরুপ আনারসের কথাই ধরা যাক- বিশ্বে সুস্বাদু আনারস উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। অধিক লাভের আশায় কৃষকরা গাছ পরিপক্ক হওয়ার আগেই রাইফেল প্লাস, সোলোবরন প্লাস, এমাইনো এসিড প্লাসসহ কয়েক প্রকার রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রন প্রয়োগ করে অকালে ফুল আনয়ন করে। দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ঘন ঘন স্প্রে করে আনারসের আকার বড় করা হয়। তিন থেকে চার বার রাইফেল প্লাস স্প্রে করে আনারস পাকানো বা রং করা হয়। সম্পুর্ন কেমিক্যাল নির্ভর এই ফলে আনারসের কোন অস্তিত্ব থাকেনা। কোন কীট পতঙ্গ ও শিয়ালও এফল খায়না। অথচ অসচেতনতার কারণে আমরা অধিক মুল্যে এই ফল কিনে রাসায়নিক পদার্থ খেয়ে থাকি। একই ভাবে আম, কাঠাল, লিচু, কলা, পেয়ারা, ডালিম, পেপেসহ অন্যান্য ফলে অতিরিক্ত মাত্রায় ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করা হয়।
একই ভাবে স্নেহের শিশু, বৃদ্ধ, বাবা মা অসুস্থ্য রোগীর জন্য এবং আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে আমরা সে সকল ফলমুল কিনে নেই তাতে শতভাগ ক্ষতিকর ফরমালিন মেশানো থাকে। এছাড়াও মাছ মাংস বিভিন্ন প্রকার শাক সবজিতেও রাসায়নিক ফরমালিন প্রয়োগ করা হয়। এসব ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহনে হাপানী, লিভার সিরোসিস ও কিডনি ডেমেজসহ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আমাদের শিশু দেরকে বাজার থেকে যে সকল চিপস, জুস, চকবার, আইসক্রিম, রঙ্গিণ কেক, কোমল পানিয় কিনে দেই তাতে বিভিন্ন ধরনের রং মেশানো থাকে। যা শিশু স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর। আমরা কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে নিজ হাতে শিশু খাদ্য তৈরীর জন্য বাজার থেকে যে ময়দা, চিনি, তেল, মরিচ, হলুদ ও সজের গুড়াসহ যে সকল নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রবাদি ক্রয় করি তা কি সত্যি ভেজাল মুক্ত? ভেজাল বিরোধী অভিযানের প্রতিবেদনে দেখা যায় চিনি ও গুড়ে রং মেশানো হয়। মরিচ ও হলুদের সাথে ইটের গুড়া, সজের সাথে গরু খোয়ারের শুকনো গোবর মিশানো হয়। সয়াবিন তেলে পোড়া মবিল ও সরিষা তেলে পামওয়েল কাপড়ের রং এবং ঝাজ ব্যবহার করে খাটি সরিষার তেল তৈরী করা হয়। শিশুদের লোভনীয় করার জন্য প্যাকেটজাত মিস্টান্নে এলোমুনিয়াম মিশ্রিত কাগজ মোড়ানো হয়। যা শিশুদের পেটে গেলে মারাত্বক পেটের পীড়া হয়ে থাকে। ঘি দিয়ে খাদ্য তৈরী করবেন তাতেও শান্তি নাই বিভিন্ন প্রানীর চর্বি কাপড়ের রং ও মিস্টি কুমড়া দিয়ে উন্নত ব্র্যান্ডের ঘি তৈরীর প্রমাণ পাওয়া যায়। মাছ ও মুরগীর খাবারে মেশানো হয় আর্সেনিকসহ বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর পদার্থ। গরুর খাদ্যে মেশানো হয় লেয়ার বা পোল্টি মুরগীর উচ্ছিষ্ট। শুটকি মাছের পোকা মাকড় দুর করার জন্য প্রয়োগ করা হয় রাসায়নিক কীটনাশক। এসব কীটনাশক পেটে গেলে শরীরে স্থায়ী ভাবে ক্ষতি হয়ে থাকে। এসব ভেজাল খাদ্য গ্রহনের ফলে জটিলতায় ভোগা মানুষ যখন সুস্থ্যতার আশায় ডাক্তারের স্মরনাপন্ন হন তখন আবার ভেজাল ওষধের খপ্পরে পরে অকালেই প্রাণ হারায়। জার্মান বেতার ডয়চে বেলের ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী শুধু ভেজাল খাদ্যের বিষ ক্রিয়ায় ৪৫ লক্ষ মানুষ জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। দেড় লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিস, ২লক্ষ কিডনি রোগ ও ৩লক্ষ মানুষ মরনব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে।
খাদ্যে ভেজালকারীরা সমাজ, জাতী ও দেশের শত্রæ। ভেজাল প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে কতিপয় পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। যেমন- বাড়ীর আঙ্গিনায় বা বাসার ছাদে প্রয়োজনীয় সবজি চাষ। ফাস্টফুট বা হোটেলে খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করা। জুস বা কোমল পানিয় পরিহার করা। মাছ ও মাংসের ফরমালিন পরিমাপক লিটমাস স্ট্রিপের ব্যবহার করা। ইলেকট্রিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করা। নিয়মিত ভেজাল বিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখা। ভেজালকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক বিচার নিশ্চিত করা।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(গ) এর ১(ঙ) ধারায় খাদ্যে ভেজাল করলে বা ওষধ মিশালে কিংবা ভেজাল খাদ্য বিক্রির উপযুক্ত প্রমাণ পেলে ১৪ বছরের কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ মৃত্যু দন্ডও হতে পারে। তবে এ আইনের আওতায় অদ্যবধি কারো শাস্তি হয়েছে কিনা জানা নাই। ভেজালের বিরু্েদ্ধ দেশে ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯ নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রন আইন ২০১৫ আছে। এসব আইনের আওতায় মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট বা অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা নিতান্তই অপ্রতুল। উন্নত বিশ্ব যখন অর্গানিক খাদ্যের গুরুত্ব দিচ্ছে আমাদের দেশের অসাধু ব্যবসায়ীগন তখন অধিক মুনাফা লাভের আশায় ভেজালযুক্ত লোভনীয় খাদ্য উৎপাদনে প্রতিযোগীতায় মত্ত। তাই প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে হলেও কঠোরভাবে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা এবং ভেজালকারীদের দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তির আওতায় আনা তখন সময়ের দাবী। তাই আসুন সবাই মিলে অঙ্গিকার করি, ভেজালমুক্ত খাদ্যের দেশ গড়ি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এ জাতীয় আরও খবর